- ঐতিহ্য, জাতীয়, নরসিংদীর খবর, লিড নিউজ, শিক্ষা ও সাহিত্য, সারাদেশ

বঙ্গীয় সমাজে শারদোৎসব বিনির্মাণে সাহিত্য রাজনীতি ও সামাজিক শানে নুযুল – সাখাওয়াত জামিল সৈকত

বাংলাদেশ, পশ্চিমবঙ্গ ও নেপালসহ বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে থাকা এই তিন অঞ্চলের সনাতন ধর্মের লোকজনের প্রধান ধর্মীয় উৎসব শারদীয় দুর্গাপূজো। এছাড়া উপমহাদেশের অন্যান্য হিন্দু ধর্মাবলম্বী লোকজন দুর্গাপূজোকে তেমন গুরুত্ব সহকারে পালন করেন না।

হিন্দু শাস্ত্র অনুসারে দুর্গাপূজো মূলত বাসন্তী মানে যেটা বসন্তকাল বা চৈত্র মাসের কৃষ্ণপক্ষে উদযাপিত হয়ে থাকে। কিন্তু বাঙালিরা পালন করেন শারদীয় বা শরৎকালের দুর্গোৎসব। মানে আশ্বিন মাসের কৃষ্ণপক্ষে। যদিও দুর্গাপূজো বছরভেদে কার্তিক মাসেও গিয়ে গড়ায়।

বাঙালির এই শারদপ্রীতির পেছনে গভীর রাজনৈতিক, সামাজিক ও সাহিত্যিক শানে নুযূল রয়েছে।

আনুমানিক খ্রিস্টপূর্ব তৃতীয় শতকে বাল্মীকি মুনি রচিত আদি রামায়ণ মতে রাবণ ছিলেন শিব ও তার স্ত্রী পার্বতীর (দুর্গার অন্য নাম) উপাসক। অবতার রাম রাবণেরই রক্ষাকর্ত্রী পার্বতী বা দুর্গার কঠোর উপাসনা করে রাবণকে লঙ্কাযুদ্ধে হারিয়েছেন এরকম কোনো বক্তব্য বাল্মীকি রামায়ণে নেই। উপমহাদেশের অন্যান্য ভাষায় অনূদিত কোনো রামায়ণে এরকম ঘটনার বিন্দুমাত্র উল্লেখ নেই।

তবে কালিকা পুরাণ ও বৃহদ্ধর্ম পুরাণে এই ঘটনার উল্লেখ আছে। এরপর পঞ্চদশ শতকে নদীয়া জেলার কৃত্তিবাস ওঝা গৌড়ের সুলতান রুকনদ্দিন বরবক শাহ এর নির্দেশে বাংলায় রামায়ণ অনুবাদ করতে গিয়ে সাহিত্যিক পুন:নির্মাণ করলেন। তিনি রাম কর্তৃক দেবী দুর্গার সন্তুষ্টি অর্জনের দীর্ঘ আখ্যান রচনা করলেন কৃত্তিবাসী রামায়ণে। বাংলায় অনূদিত এই রামায়ণে বাঙালি প্রথম জানতে পারলো কীভাবে রাম বিশ্ব সংসার তন্নতন্ন করে খুঁজে আনা ১০৮টি নীলপদ্ম ও চেষ্টা তদবিরে দেবী দুর্গার মন জয় করলেন। ফলাফল দাঁড়ালো এই যে, দেবী দুর্গা আর তার পুরাতন উপাসক রাবণের প্রতি সন্তুষ্ট রইলেন না, রামের প্রতি সদয় হলেন।

উল্লেখ্য, রাম যখন লঙ্কায় তখন শরৎকাল। হিন্দু শাস্ত্র মতে এসময় দেবদেবীগণ ঘুমিয়ে থাকেন। পূজো অর্চনা করে এরকম সময়ে তাদের ডাকাডাকি করা শাস্ত্রবিরুদ্ধ। কিন্তু যুদ্ধলাভের বাসনায় শরৎকালেই রাম দেবী দুর্গার পূজো শুরু করেন আশ্বিনের কৃষ্ণপক্ষে। ভুল সময়ে বা অ-কালে পূজো দিয়ে দেবীর বোধন বা ঘুম ভাঙানো হয়েছে বলে এই পূজোকে অকালবোধন বলা হয়।

বাংলায় রামায়ণ রচনার পূর্বে শিক্ষিত বাঙালি রামায়ণ পড়তে পারলেও অর্থ কমই বুঝতো। কিন্তু কৃত্তিবাসের অমর কীর্তির পয়ার ছন্দে লেখা রামায়ণের কাহিনি শিক্ষিত-অশিক্ষিত সকলের মাঝে ছড়িয়ে পড়লো এবং জনপ্রিয় হলো পরবর্তী কয়েক শতাব্দীতে। হিন্দু- মুসলিম, নারী-পুরুষ, ধনী-ফকির নির্বিশেষে দেবী দুর্গা ব্যাপক জনপ্রিয়তা লাভ করেন মধ্যযুগে। এ সময়ে কৃত্তিবাসের দ্বারা অনুপ্রাণিত হয়ে মধ্যযুগের বাঙালি কবিরা রচণা করলেন চণ্ডীমঙ্গল কাব্য। চণ্ডী দেবী দুর্গার একটি রূপ। এভাবেই সাহিত্যিকগণ দেবী দুর্গাকে অপরাপর দেব-দেবীর চেয়ে উজ্জ্বলরূপে তুলে ধরলেন বাঙালিদের সামনে। দেবরাজ ইন্দ্র দেবী দুর্গার চেয়ে অধিক ক্ষমতাবান কারণ তার আছে সবচেয়ে শক্তিশালী অস্ত্র বজ্র। কিন্তু বাঙালি সমাজ পুরুষ দেবতাদের কাছ থেকে ধার করা অস্ত্রসজ্জিত দেবী দুর্গাকে অধিক পছন্দ করেছেন। বাঙালি সমাজ নারীদের দেবী, রাক্ষুসী, পরী ও অপ্সরী হিসেবে দেখতে অধিক পছন্দ করেন আবহমান কাল থেকে। পাঠকদের এই বৈশিষ্ট্য মাথায় রেখে দেবী দুর্গাকে ধর্ম-বর্ণ-লিঙ্গ-গোত্র-বয়স নির্বিশেষে জনপ্রিয় করে তুলতে অনুবাদক ও সাহিত্যিক কৃত্তিবাস ওঝা ও মঙ্গলকাব্যের রচয়িতাগণ অনবদ্য ভূমিকা পালন করেন নি:সন্দেহে।

দেবী দুর্গার উত্থানে রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট সমান গুরুত্বপূর্ণ। ১৮৫৭ সালের সিপাহী বিদ্রোহের পর এবং ঊনবিংশ শতক জুড়ে বাঙালির নবজাগরণ তাদের মাঝে অভূতপূর্ব জাতীয়তাবাদী চেতনার জন্ম দেয়। ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলনে বাঙালিরাই নেতৃত্ব প্রদান করেছেন প্রাথমিক পর্যায়ে, বিশেষ করে বিপ্লবী কর্মকাণ্ডে। সাদা চামড়ার অসুরদের হাত থেকে দেশমাতৃকা বা মায়ের মুক্তির সাথে দেবী দুর্গা কর্তৃক মহিষাসুর বধের মাধ্যমে স্বর্গ পুনরুদ্ধারের theme নিয়ে আগাতে থাকেন সাহিত্যিক ও রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ। মহাত্মা গান্ধীর উচ্চমার্গীয় ও সুশীল অহিংস আন্দোলনের চেয়ে দুর্গার ন্যায় সশস্ত্র আন্দোলনের মাধ্যমে ইংরেজ অসুরদের দখল হতে দেশ পুনরুদ্ধারের শিক্ষা নিয়ে কাজ করেন সাহিত্যিক ও বিপ্লবীগণ। এজন্য বাংলায় বীরকন্যা প্রীতিলতা, মাস্টারদা সূর্যসেন, ক্ষুদিরাম ও নেতাজী সুভাষ চন্দ্র বোসের ন্যায় বিপ্লবীদের আবির্ভাব ঘটেছে।

আমাদের জাতীয় কবি ১৯২২ সালে দুর্গাপূজো উপলক্ষ্যে ধুমকেতু পত্রিকায় প্রকাশ করলেন তাঁর বিখ্যাত “আনন্দময়ীর আগমনে” নামক চূড়ান্ত বিপ্লবী কবিতা। এই কবিতায় তিনি দেবীকে উদ্দেশ্য করে বললেন,

“আর কতকাল থাকবি বেটী মাটির ঢেলার মূর্তি আড়াল?
স্বর্গ যে আজ জয় করেছে অত্যাচারী শক্তি চাঁড়াল।
দেব–শিশুদের মারছে চাবুক, বীর যুবকদের দিচ্ছে ফাঁসি,
ভূ-ভারত আজ কসাইখানা, আসবি কখন সর্বনাশী?
মাদীগুলোর আদি দোষ ঐ অহিংসা বোল নাকি-নাকি
খাঁড়ায় কেটে কর মা বিনাশ নপুংসকের প্রেমের ফাঁকি। ঢাল তরবার, আন মা সমর, অমর হবার মন্ত্র শেখা,
মাদীগুলোয় কর মা পুরুষ, রক্ত দে মা রক্ত দেখা”

এভাবেই কবি নজরুলসহ অপরাপর সাহিত্যিকগণ অহিংস আন্দোলনকে satire এর মাধ্যমে দেবী দুর্গাকে রোল মডেল হিসেবে উপস্থাপন করলেন বাঙালি স্বাধীনতাকামী বিপ্লবীদের সামনে। শুরু হয়ে বঙ্গীয় সমাজে বিপ্লবী জাতীয়তাবাদী ও ধর্মীয় চেতনার এক যুগপৎ পথচলা

এবার আলোচনা করা যাক সামাজিক প্রেক্ষাপট নিয়ে। বাঙালি সমাজ নারীকে অর্থনৈতিকভাবে ও সিদ্ধান্তগ্রহণে স্বাবলম্বী হিসেবে দেখতে না চাইলেও নারীকে দেবী, রাক্ষুসী, অপ্সরী এসব ক্ষমতায় দেখতে পছন্দ করেন। বঙ্গীয় জনপদে নারী নির্যাতন নৈমিত্তিক ঘটনা হলেও রাষ্ট্রপ্রধান হিসেবে কিন্তু তুমুল জনপ্রিয় নারী নেতৃত্ব বিরাজ করে। এপার বঙ্গ, ওপার বঙ্গ দুজায়গায় কথাটি সত্য। ব্রিটিশ শাসনামলে হিন্দু জমিদারগণ প্রজাদের নির্যাতনের পাশাপাশি ধর্মীয় জীবন ও উৎসব উপহার দিয়েছিলেন। তাদের জমিদার বাড়িতে মহাসমারোহে দুর্গাপূজো ও এই সংক্রান্ত মেলা ও উৎসবের প্রচলন তারা করেন জোরালোভাবে।

আর এভাবেই সাহিত্যিক, রাজনীতিবিদ ও সমাজপতিদের অবদানে অসাম্প্রদায়িক বাংলা পেয়েছে সার্বজনীন শারদোৎসব।

শাস্ত্রমতে এবার দেবী পালকিতে চড়ে পিতার গৃহ মর্ত্যলোকে আসবেন আগামীকাল মহাসপ্তমীতে। পালকিতে চড়ে আসা মানে মর্ত্যলোকে মহামারী ঘটবে। আমরা মহামারীতেই আছি। আর বিজয়া দশমী শেষে তিনি ৪ কন্যাপুত্রসহ কৈলাসে ফেরত যাবেন হাতির পিঠে চড়ে। শাস্ত্রমতে বসুন্ধরা তখন সুজলা সুফলা হয়ে ওঠে।

করোনার পরিস্থিতিতে বাংলাদেশ মহামারীর প্রকোপ থেকে মুক্তি পাক, সুজলা সুফলা হয়ে উঠুক এই আমাদের প্রত্যাশা।

সকলকে শারদীয় দুর্গাপূজোর শুভেচ্ছা।