মহসিন খোন্দকার
শিক্ষা এখন পুরোটাই পুঁজিবাদের পেটে। জানি কথাটা অনেকের বিশ্বাস হবেনা। এজন্যেই এ ব্যাপারে দু-চারটে কথা লিখতে চাই।এখন একটা অলিখিত শ্লোগান হয়ে গেছে “টাকা যেখানে লেখাপড়া সেখানে।” একুশ শতকের এই সময়ে এসে আমরা দেখতে পাচ্ছি বিদ্যা মোটামুটি অর্থনির্ভর। আপনি খেয়াল করে দেখুন সমগ্র বাংলাদেশে যত গুলো ভালো ফলাফলের কলেজ আছে প্রায় সব গুলোই প্রাইভেট কলেজ। কারণ কী,কারণ একটাই টাকা দেন বিদ্যা নেন। রীতিমতো এই থিউরিতেই চলছে আমাদের বিদ্যা কোম্পানি। একবার চোখ মেলে চেয়ে দেখুন সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীর শিক্ষার মান আর অর্থ খরচ করা প্রাইভেট স্কুলের শিক্ষার মান।
উদাহরণ হিসেবে ধরে নিতে পারেন নরসিংদীর সবচেয়ে ভালো ফলাফল করা ব্যক্তি মালিকানাধীন একটি বেসরকারি মাধ্যমিক স্কুলকে । আমার তিন-চার জন জ্ঞাতির ছেলে-মেয়েরা ঐ স্কুলে পড়ে। এটা বললে আপনারা বাড়াবাড়ি মনে করবেন ঐ স্কুলের চতুর্থ ও পঞ্চম শ্রেণির ছাত্রছাত্রীরা যা জানে বা পারে গ্রামের ৯০% এমপিও ভুক্ত স্কুলের নবম-দশম শ্রেণির শিক্ষার্থীরা তা জানেনা বা পারেনা। বলে রাখি ঐ স্কুলের চতুর্থ শ্রেণির একজন শিক্ষার্থীর পেছনে মাসে গড়ে টাকা খরচ হয় ১৫/২০ হাজার টাকা। যা গ্রামের নিম্ন আয়ের একটি পরিবারের(চার সদস্য বিশিষ্ট) সারা মাসের খরচ।শহরের এসব স্কুলের শিক্ষার্থীদেরকে যে ভাবে গাইভটিচার,সারাক্ষণ নজরদারি,নোট-গাইড,ঘনঘন ক্লাশ টেস্টের ভেতর দিয়ে নেওয়া হয় গ্রামের সাধারণ গরীব মানুষের স্কুলের শিক্ষার্থীরা মনে হয় এর অর্ধেকও পায়না।তাই গ্রামের শিক্ষার্থীদের পিছিয়ে পড়া শুরু হয় প্রাথমিক পর্যায় থেকেই।যতটুকু শিক্ষা বা মেধা নিয়ে গ্রামের প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে যাওয়ার কথা ততটুকু বিদ্যা বা শিক্ষা নিয়ে তারা যেতে পারছেনা।পঞ্চম শ্রেণি পাশ করে শিক্ষার্থীরা ৬ষ্ঠ শ্রেণিতে গিয়ে দেখে ইংরেজি গ্রামারের বিভিন্ন আইটেমের সরাসরি ব্যবহার অথচ পঞ্চম শ্রেণিতে ৯৯%শিক্ষার্থীকে ইংরেজি বেসিক গ্রামার পড়ানোতো দূরের কথা টাচই করা হয়নি–অতএব এসব শিক্ষার্থী ৬ষ্ঠ শ্রেণিতে প্রায়োগিক গ্রামার পারবে কী করে!এভাবে ইংরেজিতে দুর্বল থেকেই তারা বাঁধাহীন ভাবে ক্লাস ডিঙ্গাতে থাকে।একজন মাধ্যমিক স্কুলের
প্রধান শিক্ষককে আমি জিজ্ঞেস করেছিলাম—৬ষ্ঠ শ্রেণির ভর্তি পরীক্ষায় যারা শূন্য পেয়েছে আপনিতো তাদেরকেও ৬ষ্ঠ শ্রেণিতে ভর্তি করে নিয়েছেন,এটা করলেন কেনো? তিনি বললেন–কী করব ভাই তাছাড়া ছাত্র পাব কোথায়? পরবর্তীতে ভর্তি পরীক্ষায় শূন্য পাওয়া এসব শিক্ষার্থী কোনো বাঁধা ছাড়াই ক্লাশ ডিঙ্গাতে থাকে।তারা এসএসসিতে গিয়ে থামে অর্থাৎ ফেল করার পর তাদের বিদ্যার ব্যর্থ দৌড় শেষ হয়।এভাবে ইংরেজির দুর্বল জ্ঞান নিয়ে যে সকল শিক্ষার্থী কলেজে যায় তারা অনেকেই ইন্টারমিডিয়েটের ইংরেজি দেখে ভড়কে যায়,অল্প সময়ে এইচএসসি পর্যায়ের কঠিন কঠিন প্রায়োগিক গ্রামার আইটেম তারা আর কোনো ভাবেই আয়ত্তে আনতে পারেনা।ব্যর্থ হয়,ব্যর্থ হওয়ার মূল কারণ আগের শ্রেণি গুলোতে ইংরেজি না শিখে অনেকটা অন্ধকারে থেকেই ক্লাস সিঁড়ি টপকানো।ইন্টারমিডিয়েটের ইংরেজি গ্রামার আইটেম গুলো একটু কঠিন তাছাড়া সময়ও পাওয়া যায় কম।তীক্ষ্ণ নজর দিয়ে দেখা গেছে শিক্ষার্থীরা ঝরে পড়ার অন্যতম কারণ হল নিচের ক্লাসে থেকে ভালো করে না পড়ে না জেনে ক্লাসে দুর্বল হতে হতে লেখাপড়ার প্রতি ধীরে ধীরে অনাগ্রহ জন্মে। এসব শিক্ষার্থীর প্রতি শিক্ষকরাও ধীরে ধীরে আগ্রহ হারিয়ে ফেলেন।ফলে না পারার রোগ,শিক্ষকের আগ্রহ বিচ্যুত এসব শিক্ষার্থী একটা সময় লেখাপড়াকে ইস্তফা দিয়ে অন্য পথে হাঁটতে শুরু করে।মূলত না পারা থেকে শুরু হয় অনাগ্রহ আর দীর্ঘ সময়ের অনাগ্রহই টেনে নেয় ঝরে পড়ার দিকে।
বর্তমানে পড়ালেখার জন্যে তিনটি ব্যাপার অতি জরুরি।তা হলো–শিক্ষিত অভিভাবক(মা বাবা) অর্থ খরচ করার সামর্থ্য ও নজরদারি করার যোগ্যতা। গ্রামের গরীব অভিভাকের তিনটি যোগ্যতা অনেকেরই নেই।আমার সন্তান পড়ছে কী পড়ছেনা,কী পড়ছে,কতটুকু পড়ছে,ক্লাসে তার পারফরম্যান্স কেমন,ক্লাস পরীক্ষায় কেমন করছে,ক্লাস ফাঁকি দিয়ে কোথাও যাচ্ছে কি না এসব কিছু তদারকি একদম জরুরি।কিন্তু দুর্ভাগ্যবশত গ্রামের অনেক অভিভাবকের এসব নিখুঁত ভাবে তদারকির যোগ্যতা টুকুন নেই।ফলে অভিভাবকদেরকে তাদের সন্তান শিক্ষকের কাছ থেকে যা করছে বা যা পড়ছে তার উপরই অন্ধ ভাবে বিশ্বাস করে বসে থাকতে হয়।সেসব সন্তান প্রায় সময়ই তাদের পিতা-মাতাকে চরমভাবে হতাশ করে থাকে।
এসব কারণেই শিক্ষা এখন অনেকটা শহরমুখী।শহরের অভিভাবকরা সন্তানের লেখাপড়ার নিয়মিত তদারকি করে থাকেন,সন্তানের স্কুল-কলেজে খোঁজ খবর নিয়ে থাকেন,অনেকে গ্রামই ছেড়ে দেন শহরে গিয়ে সন্তানের ভালো লেখাপড়া করাবেন বলে।
এবারের এইচএসসি পরীক্ষার ফলাফলে দেখা যায় সকল
বোর্ডের গড় পাশের হার ৫২.১২%। সর্বমোট ফেল করেছে ৫ লক্ষ ৯৪ হাজার ১৩ জন অর্থাৎ সকল বোর্ড মিলিয়ে প্রায় অর্ধেক শিক্ষার্থী অকৃতকার্য হয়েছে। এই ফলাফলের ভেতর দিয়ে একটি
পরিসংখ্যান ও চিত্র পষ্ট হয়েছে—গ্রামের প্রতিষ্ঠান গুলোর
ফলাফল খুবই খারাপ। বিশেষ করে বিভিন্ন উপজেলায় যে
কলেজ গুলো রয়েছে অধিকাংশের পাশের গড়
২৫/৩০%। আর খোঁজ নিয়ে দেখা গেছে মফস্বলের কলেজ গুলোতে অধিকাংশ শিক্ষার্থী অকৃতকার্য হয়েছে ইংরেজি,
আইসিটি ও বিজ্ঞানের দুয়েকটি বিষয়ে। মফস্বলে দক্ষ আইসিটি,ইংরেজি ও বিজ্ঞান শিক্ষক থাকতে চাননা,কারণ শহরে থাকলে তাদের প্রচুর প্রাইভেট কোচিংয়ের সুবিধা আছে।
মুনাফা ভালো। মফস্বলের কলেজে ফলাফল খারাপের
এটি একটি মুখ্য কারণ।
গ্রামের অনেক অশিক্ষিত ও শ্রমজীবী মানুষ
শিক্ষককে বিশ্বাস করে অনেকটা শিক্ষকের উপর তার সন্তানের পড়ালেখার সব ভার দিয়ে রুটিরুজির জন্যে দিনরাত শ্রম দিতে থাকেন।এসব সহজ-সরল অশিক্ষিত শ্রমজীবী মানুষ জানেন না–শিক্ষা হল একটি ত্রিভুজ শ্রমের ফসল।শিক্ষক পড়াবেন,শিক্ষার্থীরা গ্রহণ করবেন আর ঠিকঠাক মতো হচ্ছে কী না অভিভাবক বা পরিচালনা কমিটি তা দেখবেন।কিন্তু গ্রামীণ পর্যায়ের অনেক ক্ষেত্রেই এসব নজরদারি হয়ে উঠেনা।ফলে গ্রামের কৃষক শ্রমিক ও মেহনতি মানুষের সন্তান পড়ালেখার পথে না থেকে ধীরে ধীরে বিপথগামী হয়।কেউ ঢুকে নেশার জগতে কেউ ঢুকে মেয়ে পটকানোর পথে কেউ ঢুকে নেট জুয়ায় বা আরো নোংরা নীল দুনিয়ায় কেউ দু-চার টাকার লোভে তথাকথিত রাজনৈতিক নেতার চেলা হয়ে নেতার পেছনে ঘুরঘুর করে কেরিয়ার নষ্ট করে।এভাবে ক্রমশ লেখাপড়ার জগত থেকে তারা সরে আসে—এইচএসসি পরীক্ষায় ফেল করে অথবা পরীক্ষায় অংশ গ্রহণ করেনা।গ্রামীণ পর্যায়ের গরীব ও শ্রমজীবী মানুষ তাদের সন্তানদেরকে কেনো পড়ালেখার জগতে আনতে চাননা তার পেছনে আরও কিছু অদৃশ্য কারণ আছে–তাদের সন্তানরা গ্রামের তথাকথিত স্কুল-কলেজ থেকে এসএসসি ও এইচএসসি পাশ করে উচ্চ শিক্ষায় তেমন সুযোগ পায় না।শহরের সচেতন অভিভাবকদের সারাজীবন শাণ দেওয়া সন্তানরাই পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের মোটামুটি সব আসন দখল করে নেয়।কারণ শহরের অভিভাবকরা তাদের সন্তানদেরকে অতি অল্প বয়স থেকেই অঢেল টাকা পয়সা খরচ করে বিচিত্র বিদ্যার বাজারে ঘুরিয়ে ফিরিয়ে দারুণ পাকাপোক্ত করেন,ভর্তির সকল অন্ধিসন্ধি ঘেটে দেখান,কোচিং করান,নানান জায়গা থেকে নানান পরামর্শ নেন—গ্রামের কৃষক শ্রমিক মেহনতি মানুষের সন্তানদের এতো কিছু পাওয়ার সুযোগ নেই আর যেখানে তাদেরকে খেয়ে বেঁচে থাকার জন্যে সারাদিন সংগ্রাম করতে হয় সেখানে সন্তানের নানান কোচিং খরচ,ভর্তির জন্যে নানান দৌড়ঝাঁপ করবে কোন সময় ।তাদের সন্তানরা গ্রামের স্কুল-কলেজ থেকে কোনো রকম পাশ করে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি পরীক্ষায় অংশ গ্রহণ করে প্রতিযোগিতায় ব্যর্থ হয়।ফলে গ্রামের অভিভাবকরা চরমভাবে হতাশ হন।এসব কারণেই তারা অনেকে আগেভাগেই তাদের সন্তানকে বিদেশ পাঠিয়ে দেন অথবা অন্য কোনো কাজে ঢুকিয়ে দেন অথবা নিজের কৃষি পেশায় লাগিয়ে দেন।গ্রামীণ পার্যায়ের কলেজ গুলোর ছাত্রীদের নিয়ে বড় সমস্যা।গড়ে ১০% ছাত্রীর ইন্টারমিডিয়েট প্রথম বর্ষে অথবা দ্বিতীয় বর্ষে বিয়ে হয়ে যায়।গ্রামের গরীব ও অশিক্ষিত মানুষ মনে করেন মেয়েদের বিয়ে দেওয়ার এটাই উপযুক্ত সময়।অন্যদিকে পাত্র পক্ষ মনে করেন ইন্টারমিডিয়েট পড়ুয়া মেয়েরাই পাত্রী হিসাবে সবচেয়ে উৎকৃষ্ট।অতএব কে শুনে কার কথা।হিড়িক পড়ে বিয়ে করার আর বিয়ে দেওয়ার।বিয়ের পর শ্বশুর বাড়ির লোকজন ৯৯% চাননা তাদের বৌ মা অত সব ডিঙ্গিয়ে স্কুল-কলেজে যাক।অতএব পড়ালেখা এখানেই বন্ধ।
গ্রামের গরীব মেহনতি মানুষ তাদের সন্তানকে উচ্চ শিক্ষিত না করার পেছনে আরো একটি কারণ আছে। তারা দেখছে পড়ালেখা শেষ করে তাদের সন্তানরা চাকরি জুটাতে পারছে না।কারণ চাকুরির জগত এখনও অনেকটা বন্দি মামার জোর মানির জোর ও মাননীয়ের জোরের কাছে।গ্রামের গরীব মেহনতি মানুষের তিন জোরের এক জোরও নেই
তাই গ্রামের গরীব মানুষ এমন অনিশ্চিত পথে বেশি দূর হাঁটতে চান না ।সন্তানকে এসএসসি বা এইচএসসি পাশ করিয়ে অথবা না করিয়ে ঢুকিয়ে দেন বা পাঠিয়ে দেন অর্থ উপার্জনের পথে।
আরেকটা কথা বলে রাখি গ্রামের গরীব ও মেহনতি মানুষের সন্তানরা স্কুল-কলেজের ১০০% ছাত্রছাত্রী নয়।তারা ৫০% ছাত্রছাত্রী আর ৫০% শ্রমিক(তবে সবাই না)।তারা অনেকেই বাপের সাথে জমিতে কাজ করে,বাপের সাথে ব্যবসায় সময় দেয়,গরু-ছাগল লালন-পালন করে,হাঁস-মুরগির খামার চালায়, অটোরিকশা চালায় অথবা অন্য কোনো কাজে বাপকে সহযোগিতা করে স্কুল-কলেজে যায়।তাই শহরের ছেলে মেয়েদের আর গ্রামের ছেলে মেয়েদের লেখাপড়ার পরিবেশ পরিস্থিতি বেশ ভিন্ন।
পরীক্ষায় ফেল করার আরেক কারণ হলো আমাদের দেশে ক্ষণে ক্ষণে কারিকুলাম পরিবর্তন করা।শিক্ষক ও শিক্ষার্থী একটা কারিকুলামের সাথে এডজাস্ট হতে না হতেই আরেকটা নতুন কারিকুলাম নিয়ে হাজির হোন জাতীয় পণ্ডিতরা।শিক্ষকরা নতুন কারিকুলামে পড়াতে গিয়ে এবং শিক্ষার্থীরা পড়তে গিয়ে একটি হ-য-ব-র-ল অবস্থার সৃষ্টি হয়।শিক্ষার্থীরা তখন ফেল করে বসে।ফেল করার আরেক কারণ এমপিওভুক্ত স্কুল-কলেজের শিক্ষকদের উদাসীনতা।শিক্ষকদের মধ্যে আন্তরিকতার অনেক অভার রয়েছে।তারা প্রায়ই দায়সারা গোছের।অনেক শিক্ষকই শ্রেণি কক্ষ থেকে বেশি গুরুত্ব দেন প্রাইভেট টিউশনিকে।যে অভিভাবকদের টাকা আছে এবং সচেতন তারা শিক্ষকদের কাছ থেকে তার সন্তানের জন্যে বিদ্যা আদায় করে নিচ্ছেন। অন্য দিকে অশিক্ষিত ও গরীব অভিভাবকরা তেমন কিছুই পারছেননা।ফলে কিছু বিত্তবানের সন্তান ছাড়া বাকিরা অবহেলিত হচ্ছে এবং ফেল করছে।এইচএসসিতে অধিকাংশ পরীক্ষার্থী ফেল করে ইংরেজিতে।এর কারণ আগেই বলেছি–ছোট কাল থেকেই তারা ইংরেজিতে দুর্বল হয়ে আসে তাছাড়া মফস্বলে দক্ষ ইংরেজি শিক্ষকের খুবই অভাব।অনেক ইংরেজি ও গণিতের শিক্ষক মফস্বল স্কুল কলেজে শিক্ষকতা করলেও থাকেন শহরে।তার কারণ শহরে প্রাইভেট টিউশনির বাজার ভালো।গ্রামের গরীব ও মেহনতি মানুষের সন্তানরা কম প্রাইভেট পড়ে—পড়লেও অনেক ক্ষেত্রে কম টাকা দেয় অনেক ক্ষেত্রে দিতেই পারেনা।তাই তারা শহরে থাকেন—এজন্যে মফস্বলের শিক্ষার্থীরা ভালো ইংরেজি ও গণিত শিক্ষকের সান্নিধ্য বঞ্চিত হয় এবং ফেল করে।
জুলাই আন্দোলন পর থেকে লক্ষ্য করছি–ছাত্র-ছাত্রীরা অধিকাংশই লেখাপড়ায় মনোযোগী না।আনন্দ করছে,হৈচৈ ও চেঁচামেচি করছে,রেস্টুরেন্টে খাওয়া-দাওয়া করছে,বাইক নিয়ে এদিক সেদিক ছুটাছুটি করছে।জুলাই আন্দোলনে অংশ গ্রহণের পর তাদের উচিত ছিল পড়ার টেবিলে বসা কিন্তু অনেকেই বসেনি।আমার মনে হয় সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষও তাদেরকে শ্রেণি কক্ষে বা পড়ার টেবিলে ফিরে যেতে বলেন নি।ফলে মূলত ক্ষতিটা হয়েছে শিক্ষার্থীদের।তাদের অনেকের মধ্যেই ছাত্রছাত্রী সুলভ আচরণ নেই সে স্থলে নতুন একটা হিরোইজম ভাব এসেছে ফলে তারা এখানে সেখানে ঘুরছে,ছুটছে,–পড়ায় তেমন মনোযোগ নেই।ফলে পরীক্ষায় অনেকেই ফেল করেছে।
বর্তমানে পরীক্ষায় ফেল করার অন্যতম কারণ নেট আসক্তি। তারা অনেকেই নেটে বুদ হয়ে থাকে।আমার এক স্যার বলেছিলেন—একজন তরুণ তরুণী নষ্ট হতে বেশি সময় লাগবেনা। তাকে একটি নেটযুক্ত স্মার্ট ফোন আর একটি নির্জন কক্ষ দিয়ে দাও দু’সপ্তাহের মধ্যে সে নষ্ট হয়ে যাবে।
এই নেটে ভালো মন্দ দুটোই আছে। তবে আমাদের তরুণ তরুণীরা খারাপটাই গ্রহণ করছে বেশি।ফেইসবুকে বন্ধু তৈরি করে তাদের নিয়ে সময় ব্যয় করছে।এই বন্ধু বান্ধবীকে সময় দিতে গিয়ে অনেক শিক্ষার্থীর পড়ালেখা লাটে উঠছে।এই জগতের আকুল আচ্ছন্নতায় বাড়ছে সামাজিক ও মানসিক অস্থিরতা,বাড়ছে তরুণ তরুণীদের অযথা আউটিং।রঙিন গল্পের অন্তরালে চলে যাচ্ছে ঢের সময়।এসব কারণেও ফেল করছে বহু পরীক্ষার্থী।
গত বছর এইচএসসিতে ৫৮.৮৩ % পাশ করায় এবং আগের বছর গুলোতো ৭৭.৭৮% ও ৭৮.৬৪% পাশ করায় অনেকে হা-হুতাশ করছেন।বিভিন্ন কলেজের শিক্ষক ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানকে দোষারোপ করছেন।আমি মনে করি এটাই আমাদের বাস্তব ফলাফল।আমরা এই লেভেলেই আছি।
এই ফলাফলের পেছনে কোনো রাজনৈতিক ইচ্ছা অভিলাষ ও সস্তা বাহবা পাওয়ার আয়েশ-খায়েশ নাই।তবে পরীক্ষা যদি আরো স্বচ্ছ আরো নির্ভেজাল হয় তাহলে আমার মনে হয় পাশের হার হবে ৪০% থেকে ৫০%।আমার অনুজ প্রতিম নরসিংদী বিজ্ঞান কলেজের বাংলার প্রভাষক নাজমূল আলম সোহাগ বলেছেন– এটা ফলাফল বিপর্যয় নয় দেশের লেখাপড়ার বাস্তব অবস্থাই এটি। এভাবেই প্রকৃত মেধাবী বেরিয়ে আসবে। ফেল করা কোনো সমস্যা না—সমস্যা হলো আমি ফেলের ছাত্র আমাকে পাশ করানো–আমি ভেড়া আমাকে হরিণ বানানো,অযথা আমাকে দিয়ে ট্রজান হর্স বানানো,আমাকে দিয়ে কাগজের বাঘ বানিয়ে অথৈজলে ডুবিয়ে মারা?আমি কী এবং কতটুকু সেটা আমাকে প্রকৃতপক্ষে চিনতে দিন ও বোঝতে দিন।পাশ করা ফেল করা সব পরীক্ষার্থীকে অভিনন্দন।প্রচেষ্টার কোনো মৃত্যু নেই।।।
কবি ও লেখক,ইংরেজি সাহিত্যের সহকারী অধ্যাপক
কবি মহসিন খোন্দকারের মতে এইচএসসি পরীক্ষায় ফল বিপর্যয়ের কারণ ও অভিমত











