মানুষের জীবনে মানসিক সুস্থতা শুধু একটি ব্যক্তিগত বিষয় নয়; এটি তার চিন্তা, আচরণ, সিদ্ধান্ত এবং শেষ পর্যন্ত তার ভাগ্য নির্ধারণ করে। বহুবার দেখা গেছে—মানসিকভাবে অসুস্থ ব্যক্তি একসময় শারীরিকভাবেও ভেঙে পড়ে। কারণ মনই শরীরের চালিকাশক্তি। মন দুর্বল হলে শরীরও ধীরে ধীরে তার ভার বহন করতে অক্ষম হয়ে ওঠে। এই সত্য শুধু বইয়ের পাতায় সীমাবদ্ধ নয়; বাস্তব অভিজ্ঞতায় এটি নির্মমভাবে ধরা পড়ে।
দীর্ঘ ৩১ বছরের কর্মজীবনে নানা মানুষ, নানা চরিত্র ও ভিন্ন ভিন্ন মানসিকতার সঙ্গে কাজ করার সুযোগ হয়েছে। অধিকাংশ মানুষই ছিলেন স্বাভাবিক, পরিশ্রমী ও দায়িত্ববান। তবে অল্পসংখ্যক—এক বা দুই জন—এমন ব্যক্তির মুখোমুখি হয়েছি, যাঁদের চিন্তাধারা ছিল অসুস্থ, বিকৃত ও আত্মকেন্দ্রিক। সংখ্যায় তাঁরা নগণ্য হলেও তাঁদের উপস্থিতি ছিল অস্বস্তিকর এবং প্রভাব ছিল গভীর।
সবচেয়ে বেদনাদায়ক বাস্তবতা হলো—এই শ্রেণির কিছু মানুষ নিজেদের প্রকৃত যোগ্যতার তুলনায় অনেক উঁচু পদে অধিষ্ঠিত ছিলেন। পদ তাঁদের হাতে ক্ষমতা তুলে দিয়েছিল, কিন্তু সেই ক্ষমতা ধারণ করার মতো মানসিক ভারসাম্য তাঁদের ছিল না। ভাষা, চিন্তা ও আচরণ—তিন ক্ষেত্রেই সেই অসামঞ্জস্য স্পষ্ট হয়ে উঠত। একটি সুশৃঙ্খল বাক্য রচনা, সঠিক বানান ব্যবহার কিংবা সুস্পষ্ট বক্তব্য উপস্থাপন—এসব ন্যূনতম যোগ্যতাও অনেক সময় তাঁদের মধ্যে অনুপস্থিত ছিল।
কিন্তু সমস্যা শুধু অযোগ্যতায় সীমাবদ্ধ নয়; প্রকৃত সমস্যা লুকিয়ে থাকে আত্মউপলব্ধির অভাবে। এই ধরনের মানুষ নিজের সীমাবদ্ধতা দেখতে পায় না—বা দেখতে চায় না। আত্মসমালোচনা তাঁদের কাছে অপমান বলে মনে হয়। ফলে নিজের ভুল সংশোধনের পরিবর্তে তাঁরা অন্যের ভুল খোঁজায় ব্যস্ত হয়ে পড়ে। নিজেরাই যে ফাঁদ তৈরি করে, নিজেরাই যে তাতে জড়িয়ে পড়ছে—এই বোধ তাঁদের আসে না। বরং তাঁদের মনে হয়, তাঁরা নাকি অন্যদের ফাঁদে ফেলতে পেরেছে।
এই আত্মপ্রবঞ্চনা খুব নীরবে কাজ করে। বাইরে থেকে মনে হয়—ব্যক্তিটি আত্মবিশ্বাসী, দৃঢ় ও প্রভাবশালী। কিন্তু ভেতরে ভেতরে সে বাস্তবতা থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে। নিজেকে প্রশ্ন করার ক্ষমতা হারিয়ে ফেলে। আর ঠিক এখানেই শুরু হয় মানসিক অসুস্থতার প্রকৃত বিপদ। কারণ যে মানুষ নিজেকে ভুল মনে করতে পারে না, সে মানুষ কখনোই সঠিক হতে পারে না।
ক্ষমতা যখন এমন মানসিকতার হাতে যায়, তখন তা আশীর্বাদ নয়—অভিশাপ হয়ে দাঁড়ায়। ক্ষমতা তখন সেবার হাতিয়ার না হয়ে প্রতিহিংসার অস্ত্র হয়ে ওঠে। নৈতিকতা সেখানে ধীরে ধীরে অস্পষ্ট হয়ে যায়। সিদ্ধান্ত গ্রহণে যুক্তির বদলে ব্যক্তিগত রাগ, অহংকার ও স্বার্থ প্রাধান্য পায়। এতে শুধু ব্যক্তি নয়, পুরো প্রতিষ্ঠান ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
বাস্তব জীবনে আমরা দেখেছি—এ ধরনের মানসিকতার পরিণতি কখনো সুখকর হয় না। সীমাহীন দুষ্টতা, অসৎ আচরণ ও ক্ষমতার অপব্যবহার একসময় নিজেকেই গ্রাস করে। একজন ব্যক্তির ক্ষেত্রে তা এতটাই চরম পর্যায়ে পৌঁছেছিল যে শেষ পর্যন্ত তাকে আইনের আশ্রয়ে যেতে হয়েছে, কারাগারের কঠিন বাস্তবতার মুখোমুখি হতে হয়েছে। এই ঘটনা কাউকে আনন্দ দেয় না; বরং এটি আমাদের সবাইকে সতর্ক করে।
কারণ এমন পরিণতি হঠাৎ আসে না। এটি আসে ধীরে ধীরে—অগণিত ছোট ভুল, অসংখ্য অবহেলিত সতর্ক সংকেত আর লাগামহীন অহংকারের মাধ্যমে। মানুষ যখন নিজেকে জবাবদিহির ঊর্ধ্বে মনে করে, তখনই তার পতনের ভিত্তি রচিত হয়। আশঙ্কার বিষয় হলো—যদি অন্য কেউ একই পথে চলতে থাকে, তবে ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি ঠেকানো কঠিন হয়ে পড়ে।
এই শ্রেণির মানুষের আরেকটি বৈশিষ্ট্য হলো চরম স্বার্থপরতা। তাঁরা কেবল নিজের লাভ-ক্ষতিই বোঝে। প্রতিষ্ঠান, সহকর্মী কিংবা সমাজ—এসব তাঁদের কাছে গৌণ। সম্পর্ক সেখানে মূল্যবোধের নয়, সুবিধার। নিজের দোষ আড়াল করতে তাঁরা অন্যের চরিত্রে কালি ছোড়ে। ফলে ধীরে ধীরে তাঁরা বিশ্বাস হারায়, সম্মান হারায় এবং একসময় নিঃসঙ্গ হয়ে পড়ে।
মানসিক অসুস্থতা তাই শুধু ব্যক্তিগত দুর্বলতা নয়; এটি একটি সামাজিক ঝুঁকি। বিশেষ করে যখন এমন মানুষ গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তের আসনে বসে, তখন তার ভুল সিদ্ধান্ত বহু মানুষের জীবনকে প্রভাবিত করে। একটি ভুল কলমের আঁচড়, একটি পক্ষপাতদুষ্ট সিদ্ধান্ত কিংবা একটি প্রতিহিংসামূলক আদেশ—সবকিছুই দীর্ঘমেয়াদি ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়াতে পারে।
এই প্রেক্ষাপটে আত্মসমালোচনার গুরুত্ব অপরিসীম। আত্মসমালোচনা মানে নিজেকে ছোট করা নয়; বরং নিজেকে সৎভাবে দেখা। যে মানুষ নিজের ভুল স্বীকার করতে পারে, সে মানুষই সংশোধনের পথে হাঁটতে পারে। আর যে মানুষ নিজের দোষ দেখতে অস্বীকার করে, সে ধীরে ধীরে নিজের অজান্তেই আত্মবিনাশের পথে এগিয়ে যায়।
সবকিছু মিলিয়ে বলা যায়, মানসিক সুস্থতা ছাড়া পদ, ক্ষমতা বা মর্যাদা অর্থহীন। যোগ্যতা, নৈতিকতা ও মানবিকতা না থাকলে উচ্চ পদ মানুষকে রক্ষা করতে পারে না। বরং অসুস্থ মানসিকতা যখন ক্ষমতার সঙ্গে যুক্ত হয়, তখন তা আরও বিপজ্জনক রূপ নেয়—নীরবে, কিন্তু নিশ্চিতভাবে।
অতএব, ব্যক্তি হিসেবে আমাদের দায়িত্ব হলো নিজেকে নিয়মিত প্রশ্ন করা—আমি কি সঠিক পথে আছি? আমার সিদ্ধান্ত কি কাউকে অকারণে আঘাত করছে? আর সমাজ ও প্রতিষ্ঠানের দায়িত্ব হলো যোগ্যতা ও মানসিক সুস্থতাকে গুরুত্ব দেওয়া। কারণ শেষ পর্যন্ত সত্য একটাই—অসুস্থ মন মানুষকে অন্ধকারের দিকে টেনে নিয়ে যায়, আর সুস্থ মনই পারে মানুষ ও সমাজকে আলোর পথে এগিয়ে নিতে।
সবকিছু মিলিয়ে বলা যায়, মানসিক সুস্থতা ছাড়া পদ, ক্ষমতা বা মর্যাদা অর্থহীন। যোগ্যতা, নৈতিকতা ও মানবিকতা না থাকলে উচ্চ পদ মানুষকে রক্ষা করতে পারে না; বরং অসুস্থ মানসিকতা যখন ক্ষমতার সঙ্গে যুক্ত হয়, তখন তা নীরবে কিন্তু নিশ্চিতভাবে মানুষকে ধ্বংসের পথে ঠেলে দেয়। এই ধ্বংস হঠাৎ আসে না—এটি আসে ধাপে ধাপে, ভুল সিদ্ধান্তের পর ভুল সিদ্ধান্তের মধ্য দিয়ে।
আসল ট্র্যাজেডি এখানেই—মানুষ অনেক সময় নিজের হাতেই নিজের জাহান্নামের রাস্তা তৈরি করে, অথচ আত্মপ্রবঞ্চনায় সেটিকেই জান্নাত বলে মনে করে। ক্ষমতা, সুবিধা ও সাময়িক সাফল্যের মোহে সে বুঝতেই পারে না যে সে ধীরে ধীরে কোন পথে হাঁটছে। তখন আর কাউকে দোষ দেওয়ার সুযোগ থাকে না; কারণ সেই পথচলা ছিল সম্পূর্ণ নিজেরই তৈরি।
শেষ পর্যন্ত সময়ই একমাত্র নিরপেক্ষ বিচারক। সময়ের কাছে কোনো মুখোশ টেকে না, কোনো ভ্রান্ত আত্মবিশ্বাস স্থায়ী হয় না। সত্য ধীরে হলেও সামনে আসে—নগ্ন, নির্মম ও অবধারিতভাবে। তাই অপেক্ষা শুধু সময়ের; কারণ সময় একদিন ঠিকই প্রমাণ করে দেয়—যে পথকে আমরা জান্নাত ভেবেছিলাম, সেটিই ছিল আমাদের নিজের তৈরি জাহান্নামের রাস্তা।
লেখকঃ সদ্য সাবেক উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা অফিসার
নরসিংদী সদর, নরসিংদী



