শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে স্কাউট কার্যক্রম আরো গতিশীল করতে হবে – শরফ উদ্দিন আহমদ চৌধুরী

নিজস্ব প্রতিবেদক
মহা তাঁবু জলসায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে ঢাকা বিভাগীয় কমিশনার শরফ উদ্দিন আহমদ চৌধুরী
বলেন, চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় স্কাউটদের প্রস্তুত করতে হবে| সকল বিদ্যালয়ে স্কাউটিং কার্যক্রম সমান ভাবে হয় না| জেলা প্রশাসকগণ জেলা স্কাউট কমিটির সভাপতি দায়িত্ব পালন করে থাকেন। আমি জেলা প্রশাসকদের আহবান জানাবো প্রতিটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে স্কাউটকে সুসংগঠিত ও স্কাউট কার্যক্রম গতিশীল করার জন্য।
তাহলে তারা একটি সুশৃংখল জীবনে অভ্যস্ত হবে| তারা আদর্শ নাগরিক হিসেবে সমাজে অবদান রাখতে পারবে|
তিনি আরো বলেন, স্কাউট আন্দোলনের শুরুতে আমাদের লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য ছিলো শিশুদেরকে একটা শৃঙ্খলার মধ্যে নিয়ে আসা এবং তাদের প্রতিভাগুলো আছে, সেটা যদি আমরা পরিকল্পিতভাবে ব্যবহার করতে পারি, তাহলে তারা যেন সমাজে অবদান রাখার সুযোগ পাবে| শিশুদের সম্মিলিত যে শক্তি আছে সেটাকে ভালোভাবে ব্যবহারের করার উদ্যোগ থেকেই মহান রবার্ট স্টিফেনশন স্মিথ লর্ড ব্যাডেন পাওয়েল অব গিলওয়েল যাকে সারা দুনিয়ার স্কাউটরা সংক্ষেপে বি. পি. বলে জানে তিনি স্কাউটস-এর এ আন্দোলনের শুরু করেন।
তিনি নিজে পেশায় সৈনিক ছিলেন| সৈনিক জীবনের উপলব্ধি থেকে সেদিন তার মনে হয়েছিল যে, বাচ্চাদেরকে সংগঠিত করে ভালো কসজে ব্যবহার করা| সে আন্দোলন আজকে সারা পৃথিবী ব্যাপী ছড়িয়ে পড়েছে| বাংলাদেশ এর বাইরে নেই| আমরা যখন স্কুলের ছিলাম, তখন স্কাউট এর বিভিন্ন আন্দোলন দেখেছি এবং বিভিন্ন স্কুলে স্কাউটের যে আন্দোলন সেটি এখনো আছে। কখনো কখনো সব স্কুলে আমরা স্কাউটের কার্যক্রম সমানভাবে করতে পারি না|
আজকে শিক্ষার্থীদের এই বনে বিভিন্ন কাজের সাথে সম্পৃক্ত করা হয়েছে। এখানে যারা বসবাস করে তাদের সাথেও সম্পর্ক স্থাপন করা হয়েছে| প্রতিকূল পরিবেশে নিজেকে কীভাবে মানিয়ে নিতে হয় সেই প্রশিক্ষণ তাদেরকে দেয়া হয়েছে| প্রকৃতির সাথে কিভাবে নিজেকে মানিয়ে নিতে হয় সে প্রশিক্ষণও তাদের দেয়া হয়েছে| আমি বিশ্বাস করি ভবিষ্যতে পথ চলতে এ প্রশিক্ষণ তাদের সহায়ক হবে।
গত ১৯ এপ্রিল প্রকৃতির অপরূপ নীলাভূমি টাঙ্গাইল জেলার মধুপুর উপজেলার দোখলা জাতীয় উদ্যানে বাংলাদেশ স্কাউটস ঢাকা অঞ্চলের প্রথম আঞ্চলিক অ্যাডভেঞ্চার স্কাউট ক্যাম্পের মহাতাঁবু জলসা অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন টাঙ্গাইল জেলার জেলা প্রশাসক ও জেলা স্কাউটসের সভাপতি শরীফা হক।
পাহাড়ী সাজে ক্যাম্প ফায়ারের শুভ উদ্বোধন করেন ঢাকা বিভাগীয় কমিশনার শরফ উদ্দিন আহমদ চৌধুরী।বিশেষ অতিথির বক্তব্য রাখেন মধুপুর উপজেলা নির্বাহী অফিসার মোঃ জুবায়ের হোসেন, মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষা বোর্ড ময়মনসিংহ উপপরিচালক মোহাঃ নাসির উদ্দিন, বাংলাদেশ স্কাউটসের যুগ্ম নির্বাহী পরিচালক আবুল হাসানাত মোঃ মুহসিনুল ইসলাম। ক্যাম্প চীফের বক্তব্য রাখেন আঞ্চলিক কমিশনার ড. সাধন কুমার বিশ্বাস, প্রোগ্রাম চীফের বক্তব্য রাখেন আঞ্চলিক উপ কমিশনার (প্রোগ্রাম) মোঃ সায়েদ বাসিত, স্বাগত বক্তব্য রাখেন বাংলাদেশ স্কাউটস ঢাকা অঞ্চলের সম্পাদক মোহাম্মদ আতাউর রহমান| ধন্যবাদ জ্ঞাপন করেন ১ম আঞ্চলিক স্কাউট অ্যাডভেঞ্চার ক্যাম্পের সাংগঠনিক কমিটির সভাপতি মোঃ শফিকুর রহমান|
অ্যাডভেঞ্চার স্কাউট ক্যাম্পে ডেপুটি ক্যাম্প চীফের ( কেন্দ্রীয় অনুষ্ঠানাদি ও সাজসজ্জা) দায়িত্ব পালন করেন আঞ্চলিক উপকমিশনার মোঃ গোলাম মোস্তফা এলটি, ডেপুটি ক্যাম্প চীফ (নিরাপত্তা ও স্বাস্থ্যসেবা) দায়িত্ব পালন করেন আঞ্চলিক উপকমিশনার মোঃ সামসুর রহমান এলটি, ১ম আঞ্চলিক স্কাউট ক্যাম্পে গবেষণা ও মূল্যায়নের টিম লিডারের দায়িত্ব পালন করেন নরসিংদী জেলা সম্পাদক মনজিল এ মিল্লাত, আবাসন ও সাইট অপারেশন টিমের সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন মোঃ আকরাম সরকার সুমন এলটি, আশরাফুল ইসলাম রিপন সচিবালয়ের দায়িত্ব পালন করেন| নিরাপত্তা ও স্বাস্থ্য সেবা উপকমিটির সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন মুহাইমিন জামান, দীপেন ভৌমিক , রেজিস্ট্রেশন ও অভ্যর্থনা উপকমিটির সদস্য হিসেবে কাজ করেন ইয়ামিন মিয়া প্রমুখ|
তারুণ্যের শক্তি স্কাউটাররা ১৬-১৯ এপ্রিল মধুপুরের গহিন অরণ্যে অভিযান অ্যাডভেঞ্চারে অংশ নিয়ে নিম্নে উল্লেখিত কার্যক্রম করেন।
ট্রাকিং-০১
স্কাউটরা সকাল ৮টায় দোখলা জাতীয় উদ্যানে যাত্রা শুরু করে প্রকৃতির মধ্য দিয়ে প্রায় ৭ কিলোমিটার পথ পাড়ি দেয় এবং বিকেলে ৪টায় আবারও তাঁবু এলাকায় ফিরে আসে| যাত্রা পথে স্কাউটদের ৪টি পৃথক স্টেশনে ৪টি ভেঞ্চার অতিক্রম করে|
ভেঞ্চার-১ (এরিয়াল রানওয়ে): এই ভেঞ্চারে স্কাউটরা কিভাবে এরিয়াল রানওয়ে নির্মাণ করা যায় তা শিখতে পারে এবং এরপর স্কাউটদের টিমের সবাইকে একটি এরিয়াল রানওয়ে অতিক্রম করে পয়েন্ট অর্জন করতে হয়| এটি স্কাউটদের জন্য হয় রোমাঞ্চকর|
ভেঞ্চার-২ (ক্রলিং): প্রতিকূল পরিবেশে কিভাবে পথ অতিক্রম করে সে সম্পর্কে জ্ঞান অর্জন করার পাশাপাশি নির্দিষ্ট কিছু জায়গায় স্কাউটরা সবাই ক্রলিং করে অতিক্রম করে| এটি স্কাউটদের জন্য অত্যন্ত রোমাঞ্চকর|
ভেঞ্চার-৩ (রক ক্লাইম্বিং): এটি স্কাউটদের জন্য একটি অ্যাডভেঞ্চার অ্যাক্টিভিটি| এখানে তারা কৃত্রিম ওয়াল বেয়ে বেয়ে উঠে নেট বেয়ে অপর দিকে নামে| এই কার্যক্রম স্কাউটদের শারীরিক শক্তি, সাহস, আত্মবিশ্বাস এবং দলগত কাজ শেখায়|
ভেঞ্চার-৪ (রোপ মাংকি ব্রিজ); এই ভেঞ্চারে স্কাউটরা রোপ মাংকি ব্রিজ ˆতরি করার পদ্ধতি জানতে পারে এবং একটি ˆতরিকৃত রোপ মাংকি ব্রিজ অতিক্রম করে| ৪টি ভেঞ্চার সফলতার সাথে অতিক্রম করে স্কাউটরা তাঁবু এলাকায় ফিরে আসে|
ট্রাকিং-০২
স্কাউটরা সকাল ৮টায় যাত্রা শুরু করে প্রাকৃতিক পরিবেশে প্রায় ৮ কিলোমিটার পথ অতিক্রম করে এবং বিকেলে ৪:৩০ টায় আবারও তাঁবু এলাকায় ফিরে আসে|
ভেঞ্চার-৫ (সেভ দ্যা নেচার): সাধারণভাবে এটি একটি স্লোগান বা বার্তা, যা মানুষকে পরিবেশ রক্ষা, গাছ লাগানো, দূষণ কমানো, প্রাণী-পাখি সংরক্ষণ এবং প্রাকৃতিক সম্পদ নষ্ট না করার জন্য উদ্ধুদ্ধ করে| এই বিষয়ে স্কাউটরা প্রয়োজনীয় জ্ঞান আহরণের মাধ্যমে এই ভেঞ্চারে অংশ নেয়|
ভেঞ্চার-৬ (ব্যাক উডসম্যান কুকিং): এটি হলো এক ধরনের আউটডোর/প্রকৃতির মাঝে রান্নার কৌশল, যেখনে খুব বেশি রান্নার সরঞ্জাম ছাড়া প্রাকৃতিক জিনিসপত্রের সহায়তায় বা সহজ উপকরণ ব্যবহার করে খাবার রান্না করা হয়| এটি স্কাউটদের বাস্তবতায় কাজ করতে অনুপ্রেরণা জোগায়|
ভেঞ্চার-৭ (কমিউনিটি ডেভেলপমেন্ট): ক্যাম্প এরিয়ার নিকটতম একটি গ্রামে স্কাউটরা পরিদর্শন করে| পরিদর্শনকালে তারা উক্ত এলাকায় বিভিন্ন সামাজিক উন্নয়নমূলক কার্যক্রম এবং সামাজিক সচেতনতা কার্যক্রম পরিচালনা করে|
ভেঞ্চার-৮ (খেলাধুলা): এই ভেঞ্চারে স্কাউটরা ৪টি গ্রাম্য খেলায় অংশ নেয়| বৌচি, গোল্লাছুট, দাড়িয়াবান্ধা, সাতচারা এই ৪টি খেলায় অংশ নেয়ার মাধ্যমে আমাদের গ্রাম বাংলার খেলাধুলার শারীরিক ও মানসিক উপকারিতা সম্পর্কে জ্ঞান অর্জন করে| ৪টি ভেঞ্চার অতিক্রম করে বিকেলে স্কাউটরা তাঁবু এলাকায় ফিরে আসে|
ট্রাকিং-৩
টাঙ্গাইলের মধুপুর ধনবাড়ির ˆসয়দ নবাব আলী চৌধুরীর জমিদার বাড়ি পরিদর্শনে যাওয়া হয় স্কাউটদের নিয়ে| সেখানে তারা এর ইতিহাস- ঐতিহ্য, সংস্কৃতি ও সাংস্কৃতিক বিষয়াদি সম্পর্কে জ্ঞান অর্জন করতে পারে| দুপুরে স্কাউটরা তাঁবু এলাকায় ফিরে আসে|